Subscribe Us

লালমনিরহাট জেলা বিখ্যাত ব্যক্তি সম্পর্কে জেনে নেই


লালমনিরহাট জেলা১৮ জন বিখ্যাত ব্যাক্তি

০১। রমনীমোহন রায় চৌধুরীঃ

 প্রজাহিতৈষী ও বিদ্যুতসাহী জমিদার

তুষভান্ডারের জমিদার রমনীমোহন রায় চৌধুরী একজন প্রজারঞ্জক ও বিদ্যোৎসাহী জমিদার ছিলেন। তিনি কালীগঞ্জের তুষভান্ডার গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা ছিলেন তুষভান্ডারের জমিদার কালিকাপ্রসাদ রায় চৌধুরী, যার নামানুসারে কালীগঞ্জের নামকরণ হয়েছে। জমিদার রমণীমোহনের সময়ে তুষভান্ডারে ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হয়। তার প্রচেষ্টায় রাস্তাঘাটের উন্নয়ন ছাড়াও এখানে গড়ে উঠে দাতব্য চিকিৎসালয়, পোস্ট অফিস ও বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। ১২৮০ বঙ্গাব্দের দুর্ভিক্ষের সময় তিনি নিজ খরচে খাদ্য সংগ্রহ এবং দরিদ্য প্রজাদের মাঝে বিতরণ করায় বড়লাটের নিকট থেকে রায় বাহাদর উপাধি লাভ করেন। তার জন্ম তারিখ বা সালের কোন উল্লেখ পাওয়া যায় না, তবে ১২৯৪ বঙ্গাব্দের ২২ শ্রাবন ৪৫ বছর বয়সে তিনি কোলকাতায় প্রাণত্যাগ করেন বলে উল্লেখ পাওয়া যায়।

০২। মহিমা রঞ্জন রায় চৌধুরী
প্রজাবৎসল, শিক্ষানুরাগী এবং সাহিত্য-সংস্কৃতিমনা জমিদার

কাকিনার জমিদার মহিমা রঞ্জন রায় চৌধুরী বগুড়া জেলার কাহালু উপজেলার লক্ষীপুর গ্রামে ১৮৫৩ খ্রীস্টাব্দের ৩ ফেব্রুয়ারী জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিল রাম কমল মজুমদার এবং মায়ের নাম ছিল শান্তমনি। মহিমারঞ্জনের আসল নাম ছিল রাধাগোবিন্দ। কাকিনার জমিদার শম্ভুচন্দ্র রায় চৌধুরী ১২৬৩ বঙ্গাব্দের ১৮ কার্তিক তাকে দত্তক গ্রহণ করে নাম রাখেন মহিমা রঞ্জন। ১৮৬৩ খ্রিস্টাব্দের ২২ ডিসেম্বর তিনি জমিদার হিসাবে স্বীকৃত হন। তিনি একজন প্রজাবৎসল, শিক্ষানুরাগী এবং সাহিত্য-সংস্কৃতিমনা জমিদার ছিলেন। ১৮৭৪ সালের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের সময় তিনি জমিদারী খাজনা আদায় বন্ধ রাখেন এবং খাদ্য ও পানীয় জলের ব্যবস্থাকরণসহ কোষাগার থেকে প্রচুর অর্থ দুঃসহ মানুষের মাঝে বিতরণ করেন। তিনি ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক রাজা বাহাদুর উপাধি লাভ করেন। তিনি নিজে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় খুব বেশি অগ্রসর হতে না পারলেও এ অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারে যথেষ্ট অবদান রেখেছেন। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৩১২ বঙ্গাব্দের ১১ বৈশাখ গড়ে উঠে রঙ্গপুর সাহিত্য পরিষদ। তিনি এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ও আজীবন সদস্য ছিলেন। ১৯০৯ সালের ১ এপ্রিল তিনি পরলোক গমন করেন।

০৩। কাজী শেখ রেয়াজ উদ্দিন আহমেদ

শিক্ষাবিদ, ঐতিহাসিক, সাহিত্যিক

১৮৮৩ সালের জানুয়ারী মাসে কালীগঞ্জের দলগ্রাম ইউনিয়নের কাজী পরিবারে কাজী শেখ রেয়াজ উদ্দিন আহমেদ জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম হাজী শেখ মুহম্মদ জয়েন উল্লাহ এবং মাতার নাম ফুল বিবি। তিনি একাধারে একজন লাঠিয়াল, শিক্ষাবিদ, ঐতিহাসিক, সাহিত্যিক এবং সমাজ সচেতন সংগ্রামী ব্যক্তি ছিলেন। তিনি স্যার সৈয়দ আমীর আলী রচিত শর্ট হিস্ট্রি অব দি স্যারাসেনস গ্রন্থের সার্থক অনুবাদ করেছিলেন। তিন খন্ডে অনুবাদকৃত গ্রমহটি আরব জাতির ইতিহাস নামে প্রকাশিত হয় যথাত্রুমে প্রথম খন্ড ১৯১০ সালে, দ্বিতীয় খন্ড ১৯১২ সালে এবং তৃতীয় খন্ড ১৯১৫ সালে। বাংলা একাডেমী ১৯৭১ সালে গ্রন্থটির তিন খন্ড একত্রে প্রকাশ করে। তাছাড়া তিনি ১৮৯৬ সালে লন্ডন ও আলীগড় থেকে প্রকাশিত Sir Thomas Walker Arnold রচিত The Preaching of Islam গ্রন্থটি অনুবাদ করে এর নাম দেন ইসলাম প্রচারের ইতিহাস। তার রচিত উপন্যাস মালেকা ১৯২০ খ্রিস্টব্দে প্রকাশিত হয়। কাজী শেখ রেয়াজ উদ্দিন আহমেদ একজন লাঠিয়াল হিসেবে ব্যাপক পরিচিত ছিলেন। তিনি ১৯৩৪ সালে প্রতিষ্ঠিত নিখিল বঙ্গ লাঠিয়াল সমিতির সভাপতি ছিলেন। দেশ বিভাগের পর এ সমিতির নাম হয় পূর্ব পাকিসতান লাঠিয়াল বাহিনী। প্রায় ২০ হাজার লাঠিয়াল এ বাহিনীর সদস্য ছিল। পাকিসতান সরকার তাকে তমঘা-ই মজলিস খেতাবে ভূষিত করে। ১৯৭২ সালের ২৫ জুন তিনি মারা যান।

০৪। শেখ ফজলল করিম

কবি

স্বর্গ ও নরক শীর্ষক কবিতাখানি লিখে যিনি বাংলা সাহিত্যে অমর হয়ে আছেন তিনি লালমনিরহাট জেলার কাকিনার কবি শেখ ফজলল করিম। নীতিবাদী সাহিত্যসাধক কবি শেখ ফজলল করিমের জন্ম ১৮৮৩ সালের ১৪ এপ্রিল কালীগঞ্জের কাকিনা গ্রামে। তাঁর মাতার নাম কোকিলা বিবি। পিতামহ জসমত উল্লাহ সরদার ছিলেন জমিদার শম্ভুরঞ্জন রায় চৌধুরীর একজন বিশ্বস্থ কর্মচারী। পাঁচ ভাই ও তিন বোনের মধ্যে শেখ ফজলল করিম দ্বিতীয় ছিলেন। বিভিন্ন কারণে তিনি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় খুব বেশি অগ্রসর হতে পারেননি। মাইনর পাশের পর তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি ঘটে। তাঁর সম্পাদনায় ১৯০৮ সালে কাকিনা থেকে প্রকাশিত হয় বাসনা নামে একটি মাসিক পত্রিকা। তৎকালে এ পত্রিকা ভূয়সী সুনাম অর্জন করেছিল। অতঃপর ১৯৩০ সালে শিশুদের জন্য জমজম নামে একটি মাসিক পত্রিকার সম্পাদনা শুরু করেন। তাঁর রচিত গ্রমেহর মধ্যে রয়েছে তৃষ্ণা, মানসিংহ, এসবাত-ইস-ছামী বা ছামী তত্তব, পরিত্রান, ভগ্ণবীণা, লাইলী মজনু, মহর্ষী এমাম রব্বানী মুজাদ্দেদ আলফেসনী (রহঃ), আফগানিস্থানের ইতিহাস, পথ ও পাথেয়, চিন্তার চাষ, বিবি রহিমা, রাজর্ষী এবরাহীম, বিবি খাদিজা, বিবি ফাতেমা সহ আরও অনেক গ্রন্থ। সমসাময়িক কালের মুসলিম কবি-সাহিত্যিকগণের মধ্যে তাঁর অবস্থান ছিল প্রথম সারিতে। ১৯৩৬ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর মধ্য রাতে কাকিনায় নিজ বড়িতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বাড়ির সম্মূখে তাকে সমাহিত করা হয়।

০৫। শেখ শাহাদাৎ উল্লাহ বসুনিয়া

কবি

পাটগ্রামের বাউরা ইউনিয়নের জমগ্রামে ১২৯৯ বঙ্গাব্দের ১৫ আশ্বিন জন্মগ্রহণ করেন কবি শেখ শাহাদাৎ উল্লাহ বসুনিয়া। তার পিতার নাম আমানত উল্লাহ বসুনিয়া। ১৯১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে প্রকাশিত হয় তার রচিত কাব্যগ্রন্থ জমজম ফোয়ারা, ১৯২৬ সালের নভেম্বর মাসে গার্হস্থালী মুষ্টিযোগ বা টোটকা চিকিৎসার প্রথম ভাগ। ১৩৮৬ বঙ্গাব্দের ১ কার্তিক শেখ শাহাদাৎ উল্লাহ বসুনিয়া শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
০৬। কান্তেশ্বর বর্মন
রাজনীতি

কান্তেশ্বর বর্মন ১৮৯৬ সালের ১ ফেব্রুয়ারী বর্তমান লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী উপজেলাধীন সারপুকুর ইউনিয়নের মুশর দৈলজোড় গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম রত্নেশ্বর বর্মন পঞ্চায়েত এবং মাতার নাম কুঞ্জমারী বর্মনী। তিনি ১৯১৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। অতঃপর কাকিনা রাজের সানুগ্রহে তিনি কোলকাতা সেন্ট পল কলেজে ভর্তি হন এবং সেখান থেকে ১৯১৭ সালে এফ. এল. পাশের পর ডিগ্রিতে ভর্তি হন। কিন্তু ১৯১৯ সালে স্বরস্বতী পূজাকে কেন্দ্র করে কলেজ কর্তৃপক্ষের সাথে তার সম্পর্কের অবনতি ঘটার কারণে ডিগ্রি পরীক্ষায় অংশ নেয়ার আগেই তাকে কলেজ ছাড়তে হয়। শিক্ষানুরাগী কান্তেশ্বর বর্মণ ১৯৪২ সালে তার শিক্ষাগুরু গিরিজা শংকর এর নামে আদিতমারীতে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। প্রতিষ্ঠালগ্ণ থেকে ১৯৫৭ সাল পর্যন্ত তিনি বিনা বেতনে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। কান্তেশ্বর বর্মণ ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট থেকে অংশগ্রহণ করে পূর্ব পাকিস্থান আইন পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৬৭ সালের ২২ ডিসেম্বর তিনি পরলোক গমন করেন।

০৭। অমূল্যধন মুখোপাধ্যায়
শিক্ষাবিদ, গবেষক ও সাহিত্যিক

উপমহাদেশের খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ, গবেষক ও সাহিত্যিক অমূল্যধন মুখোপাধ্যায়ের জন্ম ১৯০২ সালে পাটগ্রামে। তিনি ১৯২৭ থেকে ১৯৩৮ সার পর্যন্ত রংপুর কারমাইকেল কলেজে, অতঃপর ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত কোলকাতার আশুতোষ কলেজে এবং ১৯৬৫ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যমত যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। ইংরেজী ও বাংলা সাহিত্য ছাড়াও সংস্কৃত ছন্দ সম্পর্কে তিনি অনেক গবেষণামূলক প্রবন্ধ ও গ্রন্থ রচনা করেছেন। তার রচিত গ্রন্থের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে Sanskrit Prosody, Its Evolution, বাংলা ছন্দের মূলসূত্র, কবিগুরু, আধুনিক সাহিত্য জিজ্ঞাসা। তিনি ১৯৮৪ সালের ২০ মার্চ পরলোকগমন করেন।

০৮। মাওলানা বজলুর রহমান
প্রখ্যাত আলেম ও ইসলামী চিন্তাবিদ

এ অঞ্চলের প্রখ্যাত আলেম ও ইসলামী চিন্তাবিদ মাওলানা বজলুর রহমান ১৯১৬ সালের ৩০ এপ্রিল লালমনিরহাট সদর উপজেলার গোকুন্ডা ইউনিয়নের মোল্লাটারী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতা কাজী নজিরতদ্দিন রংপুর কারামতিয়া মাদ্রাসার শিক্ষক ছিলেন, যা পরবর্তীতে কারামতিয়া হাইস্কুল হিসাবে পরিচিতি ও প্রতিষ্ঠা লাভ করে। মাওলানা বজলুর রহমান কোলকাতা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে ১৯৩৫ সালে আলিম, ১৯৩৭ সালে ফাজিল এবং ১৯৩৯ সালে মুমতাজুল ফুকাহা সনদ অর্জন করেন। ১৯৪৩ সালে তার শিক্ষা ও দীক্ষাগুরুর নামে তিসতা মোশতাক আহমদ ফাজিল মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন এবং জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি উক্ত মাদ্রাসায় দায়িত্বরত ছিলেন। তারই উদ্যোগে তিস্তায় প্রতিষ্ঠা লাভ করে একটি সমৃদ্ধ কুতুবখানা, যা ‘তিসতা কুতুবখানা’ নামে পরিচিত। ১৯৬৫ সালের ১৫ জুন তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন।

০৯। ধর্ম্মনারায়ণ সরকার ভক্তিশাস্ত্রী
গবেষক

১৯১৭ সালের ৩০ ডিসেম্বর কালীগঞ্জের দলগ্রাম ইউনিয়নের শ্রীখাত গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন উত্তরাঞ্চলের প্রখ্যাত গবেষক ধর্ম্মনারায়ণ সরকার ভক্তিশাস্ত্রী। তার পিতার নাম রামহরি সরকার এবং মাতার নাম ধনেশ্বরী দেবী। ১৯৪১ সালে তিনি প্রতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শেষ করে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। দলগ্রামে তিনি ‘দাদাভাই যুব নাট্য সংঘ’ নামে একটি নাট্যগোষ্ঠী গড়ে তুলেছিলেন। তার লেখা দুটি নাটক ‘দাদা’ এবং ‘নাটক নয়’ বহু স্থানে মঞ্চস্থ হয়েছিল। ১৯৭৬ সালের ৩১ জানুয়ারী তিনি শিক্ষকতা পেশা থেকে অবসর নেয়ার পর ইতিহাস-ঐতিহ্য বিষয়ে গবেষণা এবং পরমার্থিক প্রচারে আত্মনিয়োগ করেন। তার রচিত তিনটি গ্রন্থের মধ্যে ১৩৯০ বঙ্গাব্দের ১৪ ভাদ্র প্রকাশিত হয় উত্তরবঙ্গীয় রাজবংশী ক্ষত্রিয় জাতির ইতিহাস, ১৩৯১ বঙ্গাব্দের ২৩ ভাদ্র রায় সাহেব পঞ্চানন এবং ১৩৯২ বঙ্গাব্দের ২৭ মাঘ প্রকাশিত হয় উত্তর বাংলার লোক সাহিত্য ও ভাষা। তিনি ১৯৮১ সালে বিশ্ব বৈষ্ণব রাজসভা থেকে ‘ভক্তিশাস্ত্রী’ উপাধি ও সম্মান লাভ করেন এবং ১৯৮২ সালে নবদ্বীপধাম প্রচারণী সভা তাকে ‘উপদেশক’ উপাধি ও সম্মান প্রদান করেন। ১৯৯২ সালের ১৯ অক্টোবর তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন।

১০। সেরাজুল হক
কবি, চিকিৎসক

কবি, চিকিৎসক এবং বহু গুণে গুনাণ্বিত সেরাজুল হক ১৯১৮ সালে অবিভক্ত বাংলার (বর্তমান ভারতের) জলপাইগুড়ি জেলাধীন ময়নাগুড়ি থানার মাধবডাঙ্গা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আইন উদ্দিন এবং মাতার নাম আমিরন নেছা। তিনি ১৯৩৬ সালে মেট্রিকুলেশন পাশ করেন এবং ১৯৩৯ সালে ঢাকাস্থ এগ্রিকালচার ইনসটিটিউশন থেকে কৃষি বিষয়ে প্রশিক্ষণ গ্রহণের পর ১৯৪০ সালে ওভারশিয়ার হিসেবে ব্রিটিশ সরকারের অধীনে চাকুরীতে যোগদান করেন। চাকুরিরত অবসহায় তিনি ১৯৪৫ সালে ইন্টারমিডিয়েট পাশ করেন। অতঃপর তিনি কোলকাতা থেকে হোমিওপ্যাথে এইচ.এম.বি. ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করার পর তিনি শিক্ষকতা ছেড়ে দিয়ে উন্নত পদ্ধতিতে চাষাবাদের পাশাপাশি হোমিও চিকিৎসা শুরু করেন। হোমিও চিকিৎসায় তিনি যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেন। ছন্দ-কাব্য রচনায় তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্থ। ১৯৬৩ সালে ‘চাষা ও কাঠমোল্লার বাহাজ’ নামে তার একটি কবিতার বই প্রকাশিত হয়। তিনি ছিলেন একজন বহুভাষী ব্যক্তিত্ত্ব। আরবী, উর্দূ, হিন্দি, সংস্কৃত এবং ইংরেজী ভাষায় ছিল তার অসামান্য দখল। জীবনের অনেক সময় তিনি রাজনীতিতে অতিবাহিত করেছেন। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও তিনি ন্যাপ (ভাসানী) পার্টির কালীগঞ্জ থানার সভাপতি ছিলেন। ১৯৯২ সালের ৭ এপ্রিল এ গুণী মানুষের জীবনাবসান ঘটে।

১১। আশরাফ আলী
ভাষাসৈনিক, সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং শিক্ষানুরাগী

ভাষাসৈনিক, বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক সংগঠক এবং শিক্ষানুরাগী ব্যক্তিত্ত্ব আশরাফ আলীর জন্ম ১৯১৮ সালের ২০ অক্টোবর বর্তমান কুড়িগ্রাম জেলার নাগেশ্বরী উপজেলাধীন কালীগঞ্জ ইউনিয়নের কুমেদপুর গ্রামে। তার পিতার নাম ওমর আলী মুন্সী এবং মাতার নাম আকলিমা খাতুন। তিনি রেল বিভাগে চাকুরী নিয়ে ১৯৪০ সালের দিকে লালমনিরহাটে চলে আসেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে ২২ ফেব্রুয়ারী রেল অঙ্গনে বাঙালীদের নিয়ে মিছিল বের করেন এবং নিজে মিছিলের নেতৃত্ব দেন। ভাষা আন্দোলনে স্থানীয়ভাবে জড়িত ছাত্রনেতাদের তিনি নিজের বেতনের অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করতেন বলেও জানা যায়। শ্রমিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তিনি পাকিস্থান আমলে দু’বার কারাবরণ করেন। রাজনৈতিকভাবে তিনি কমিউনিস্ট পার্টি ও ভাসানী ন্যাপের সাথে যুক্ত ছিলেন।

১২। আলহাজ্ব করিম উদ্দিন আহমেদ
সমাজসেবা ও রাজনীতি

আলহাজ্ব করিম উদ্দিন আহমেদ ১৯২৩ সালের ১৯ মার্চ বর্তমান লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলাধীন কাশিরাম গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম মৌলভী আছিম উদ্দিন আহমেদ এবং মাতার নাম নেছাবি বেওয়া। তিনি এক সাধারণ কৃষক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। সমাজসেবী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসাবে তিনি সুপ্রতিষ্ঠিত হন। তিনি ১৯৭০ সালে সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি একজন সংগঠক হিসেবে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। পরে তিনি ১৯৭৩ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের আইনসভারও সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯১ সালের ২৮ আগস্ট তার জীবনাবসান ঘটে।

১৩। রেয়াজ উদ্দিন আহমেদ,
ওকালতি, রাজনীতি, সংগঠক

লালমনিরহাট জেলা গঠনে অগ্রণী ভূমিকা পালনকারী বিশিষ্ট রাজনীতিক রেয়াজ উদ্দিন আহমেদের জন্ম ১৯২৩ সালের ২৪অক্টোবর। তিনি ‘ভোলা’ নামেও পরিচিত ছিলেন। তার পিতার নাম দালার উদ্দিন আহমেদ এবং মাতার নাম রহিমা বেগম। রেয়াজ উদ্দিন আহমেদের পিতা ছিলেন কুড়িগ্রামের একজন খ্যাতনামা উকিল। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা জীবনের শেষ পর্যায়ে তিনি ১৯৪৫ সালে কোলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বি.এ. পাশ করেন এবং আইন বিষয়ে ভর্তি হয়েও রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হওয়ায় তিনি আর লেখাপড়ায় অগ্রসর হতে পারেননি। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে কুড়িগ্রাম-লালমনিরহাট আসনে তিনি মনোনয়ন লাভ করেন এবং পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের লেকজনদের সংগঠিত করেন একজন সক্রিয় সংগঠকের ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৩ সালে স্বাধীনতাত্তোর বাংলাদেশের প্রথম নির্বাচনে তিনি কুড়িগ্রাম আসন থেকে অংশগ্রহণ করে জয়লাভ করেন। তিনি মোট পাঁচবার এমপি এবং চার বার মন্ত্রীসভায় থাকার পর ডেপুটি স্পীকার হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। রেয়াজ উদ্দিন আহমেদ এর নেতৃত্বে ১৯৮২ সালের ১৯ আগস্ট ঢাকাস্থ লালমনিরহাট জেলা বাসতবায়ন কমিটি তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এইচ. এম. এরশাদের সাথে সাক্ষাৎ করে লালমনিরহাটকে জেলায় উন্নীতকরণের দাবীনামা পেশ করেন। ফলস্বরুপ ১৯৮৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারী বাংলাদেশ সরকারের তৎকালীন সমাজ কল্যাণ ও মহিলা বিষয়ক উপদেষ্টা (মন্ত্রী) ডঃ শাফিয়া খাতুন কর্তৃক উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে লালমনিরহাট মহকুমা জেলা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৯৭ সালের ৪ ফেব্রুয়ারী তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

১৪। আজিজুর রহমান
আইনজীবি, রাজনীতিক, সমাজসেবক এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক

বিশিষ্ট আইনজীবি, রাজনীতিক, সমাজসেবক এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক আজিজুর রহমানের জন্ম ১৯৩১ সালে লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলাধীন ডাউয়াবাড়ী গ্রামে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষে তিনি রংপুর জেলা জজ কোর্টে আইন পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি তৎকালীন রংপুর জেলার কালীগঞ্জ, হাতীবান্ধা ও পাটগ্রাম থেকে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। আইন পেশা ও রাজনীতির পাশাপাশি তিনি বিভিন্ন ধরণের সামাজিক উন্নয়নমূলক কর্মকান্ডের সাথে জড়িত ছিলেন। ১৯৯৭ সালের ১১ অক্টোবর তিনি ইহলোক ত্যাগ করেন।

১৫। ড. শাফিয়া খাতুন
ভাষাসৈনিক, শিক্ষাবিদ, সংগঠক, রাজনীতি

ভাষাসৈনিক, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সংগঠক এবং সাবেক সমাজ কল্যাণ ও মহিলা বিষয়ক মমএণালয়ের উপদেষ্টা (মন্ত্রী) ডঃ শাফিয়া খাতুন লালমনিরহাট জেলার আদিতমারী উপজেলাধীন দক্ষিণ বত্রিশ হাজারী (বিন্নাগারী) গ্রামে ১৯৩১ সালের ১৫ জানুয়ারী জন্ম গ্রহণ করেন। ১৯৫২ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতিতে এম.এ. পড়ার সময়ে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। ১৯৫৩ সালে তিনি এম.এ. ডিগ্রী লাভের পর শিক্ষকতা পেশায় আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৬১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনসটিটিউট থেকে এম.এড. ডিগ্রী এবং ১৯৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর কলোরাডো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৬৬ সালে তিনি অধ্যাপক হিসেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণা ইনসটিটিউটে যোগদান করেন। তিনি ১৯৭৭ সালে বাংলাদেশ পাবলিক সার্ভিস কমিশনের সদস্য নিযুক্ত হন। ১৯৮৩ সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট এইচ. এম. এরশাদ তাকে সমাজ কল্যাণ ও মহিলা বিষয়ক মন্ত্রনালয়ের উপদেষ্টা নিয়োগ করেন। ড. শাফিয়া খাতুন ১৯৮৪ সালের ১ ফেব্রুয়ারী লালমনিরহাট জেলার শুভ উদ্বোধন করেন। এ মহীয়সী নারী ১৯৯৩ সালের ১১ ফেব্রুয়ারী ইহলোক ত্যাগ করেন।

১৬। আবিদ আলী
ভাষাসৈনিক, রাজনীতিক ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক

লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার জগতবেড় গ্রামে ১৯৩৫ সালের ৩০ এপ্রিল বিশিষ্ট ভাষাসৈনিক, রাজনীতিক ও মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক আবিদ আলী জন্মগ্রহন করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তার নেতৃত্বে পাটগ্রামের অধিকাংশ এলাকা পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর দখলমুক্ত ছিল। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর আবিদ আলী ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০০১ সালে তার জীবনাবসান ঘটে।

১৭। তমিজ উদ্দিন বীরবিক্রম
মুক্তিযুদ্ধে অসাধারন অবদান

মুক্তিযুদ্ধের সময় অসামান্য অবদান রাখার জন্য বীরবিক্রম খেতাব প্রাপ্ত তমিজ উদ্দিনের জন্ম ১৯৪০ সালে লালমনিরহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলাধীন তুষভান্ডার ইউনিয়নের সুন্দ্রাহবি গ্রামে। তার পিতার নাম সয়েফ উল্লাহ এবং মাতার নাম তমিজন্নেছা।

১৮। শাহজাহান
মুক্তিযুদ্ধের প্রথম শহীদ

লালমনিরহাট জেলায় একাত্তরে প্রথম শহীদ শাহজাহানের জন্ম ১৯৫১ সালে লালমনিরহাট পৌর এলাকার থানাপাড়ায়। তার পিতার নাম আবদুর রহমান দুলাল এবং মাতার নাম শাহেরননেছা। ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ বিকেলে তিনি শহীদ হন। শহীদ শাহজাহানের স্মৃতিকে অম্লান করে রাখার জন্য শহরের আপইয়ার্ড কলোনীর নাম পরিবর্তন করে শাহজাহান কলোনী রাখা হয়।