পাকযন্ত্রের পীড়ায় বেলের তুল্য আর কোনো দ্বিতীয় ওষুধ নেই। বিশেষ
করে আমাশয় নিবারণে, অম্ননাশে, রক্তার্শ নিরাময়ে, পরিপাক যন্ত্রের গোলযোগ উপশমে,
গাত্র দুর্গন্ধ দূরীকরণে, মদির প্রবণতা রোধে, শুক্রতারল্য স্বাভাবিকিকরণে বেল একটি
শ্রেষ্ঠ ওষুধ। বেল কাঁচা অবস্থায় খেতে হয়। পাকা অবস্থায় নয়। পাকা বেল স্বাস্থ্যের
পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর। সব ফল পাকলেই তার গুণের উৎকর্ষ ঘটে, বেলের ক্ষেত্রে সেটি
উল্টো। বেল কাঁচাই উপকারী। বলা হয়, পাকা বেল বিষবৎ, শরীরের পক্ষে খতিকর। আর কাঁচা
বেল অমৃতের সমান গুণকর।' এটি এ জন্য যে, পাকা বেল হজম হয় খুব কষ্টে। এটি বহু দোষের
আকর। যার জন্য পাকা বেল ভক্ষণের ফলে পেটে দুর্গন্ধ বায়ুর সৃষ্টি হয় এবং কখনো কখনো
এটি এমন বিপরীত গুণ নিয়ে আত্মপ্রকাশ করে যা অতীব ভয়াবহ। আমাশয় আক্রান্ত ব্যক্তি
এবং অম্ল রোগীরা পাকা বেল খেলে সাথে সাথেই তা টের করতে পারেন। পক্ষান্তরে স্বভাবে
ও গুণে কাঁচা বেল সংগ্রাহী। অর্থাৎ কচি বা কাঁচা অবস্থায় বেল ব্যবহার করলে তখন এটি
হয় স্নিগ্ধ উষ্ণবীর্য অথচ তীক্ষ্ণ এবং অগ্নির উদ্দীপক। কাঁচা বেল কফ ও বায়ুর
জয়কারক। তবে এখানে একটি প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক। অনেকে বলবেন, পাকা বেল খেলে কোষ্ঠতো
বেশ পরিষ্কার হয়। পরিষ্কার হয় বটে, তবে তা ইচ্ছে করে নয়। পাকা অবস্থায় বেল খেলে
অন্ত্র বা মলভান্ডের দোষকে সংশোধন না করে মল জোরপূর্বক বের করে আনে। কিন্তু কাঁচা
বেল পাচক ও অগ্নিবল বাড়িয়ে দিয়ে আমদোষ পরিপাকান্তে মল সরল করে বের করে আনে। কাঁচা
বেল অগ্ন্যাধিষ্ঠান নাড়িকে অত্যন্ত শক্তিশালী করে। কাজেই কোনো অবস্থায়ই কারুর
পক্ষে পাকা বেল খাওয়া উচিত নয়। কাঁচা বেল আগুনে পুড়িয়ে বা সিদ্ধ করে মোরববা বা
হালুয়া করে খেতে হয়। যারা মেদস্বী গায়ে ঘামের দুর্গন্ধ বেরোয়, তারা বেল পাতার রস
পানিতে মিশিয়ে ওতে শরীর মুছে নিলে দোষটি মরে যায়। বেল পাতা আগুনে সেঁকে নিয়ে ঢেকে
রেখে অতঃপর থেঁতো করলেই রস পাওয়া যায়। সর্দির প্রবণতায় বেলপাতার রস ১ চামচ (৬০
ফোঁটা) আন্দাজ খেলে কাঁচা সর্দি বা তার সাথে জ্বরজ্বর ভাব এ দোষটি সেরে যায়। শোথে
হাত-ফুলে উঠেছে, এ ক্ষেত্রে বেল পাতার রস সমপরিমাণ মধুসহ খেতে থাকলে শোথ অচিরাৎ
কমে যায়। কচি বেল টুকরো টুকরো করে কেটে রোদে শুকিয়ে নিলে ওটাকে বেলশুট বলে। বেলশুট
শহরে-গঞ্জের পশারী দোকানেও কিনতে পাওয়া যায়। বেলশুট অথবা অপক্ব কচিবেল ছয় ঘণ্টা
ধরে পানিসহ আগুনে জ্বাল করে হালুয়া আকারে খেলে অতি অল্প দিলেই অম্লরোগ নিবারিত হয়।
যে ছেলেমেয়েরা পড়াশুনা করেও মনে রাখতে পারে না, তিন থেকে সাতটি বেল পাতা ঘিরে
মুড়মুড়ে করে ভেজে অল্প মিছরির গুঁড়ো মিশিয়ে প্রত্যহ একবার করে খেতে দিলে অল্প
দিনেই তাদের স্মরণ শক্তি বেড়ে যায় এবং মেধাশক্তি প্রবল হয়। যারা দীর্ঘদিন ধরে
আন্ত্রিক ক্ষতে ভুগছেন, তারা কচি বেলের শুকনো টুকরো অর্থাৎ বেলশুট পরিমাণ মতো
বার্লির সাথে একত্রে পাক করে পরে সেটি ছেঁকে নিয়ে বার্লিটা খেয়ে নিলে অল্প দিনেই
আলসার সেরে যায়। একটুকরো বেলশুট পাউরুটির মতো সেঁকে গুঁড়ো করে টাটকা ঘোলের সঙ্গে
মিলিয়ে প্রত্যহ প্রাতে একবার করে খেলে অতি অল্প দিনেই পুরাতন আমাশয় রোগ চমৎকারভাবে
সেরে যায়। আধা চা-চামচ বেলমূলের ছাল চূর্ণ দুধের সঙ্গে মিশিয়ে খেতে থাকলে অল্প
কয়েকদিনের মধ্যে হৃদ দৌবল্য সেরে যায়। অধিকন্তু এভাবে খেলে অনিন্দ্রা ও ঔদাসীন্য
ভাবটাও কেটে যায়। গাত্রবর্ণ উজ্জ্বল করার জন্য যতগুলো উপাদান আছে বেলফুল তন্মধ্যে
শ্রেষ্ঠ। পরিমাণমত বেল গাছের ফুল মসুর ডাল ধোয়া পানির সাথে উত্তমরূপে পেষণ করে
মুখমন্ডলে ব্যবহার করলে অতি অল্প দিনেই চেহারা গোলাপের ন্যায় কমনীয়, পদ্মের ন্যায়
উজ্জ্বল ও পূর্ণচন্দ্রের ন্যায় বিকশিত হয়ে ওঠে।
